চৈতন্যের গানঃ শ্রী মহাপ্রভুর শিক্ষাস্টকম ও বাউলের ভাব

যখন প্রথম বার আমার প্রিয় পরম পূজনীয় গুরু আচার্য  শ্রী শশাঙ্ক গোঁসাই তাঁর গানের খাতাটি আমার হাতে দিলেন । তা সানুগ্রহে একটিবার মাথায় ঠেকিয়ে যখন খুলে দেখলাম তার প্রথম পাতায় একটি ময়ূরের ছবি আঁকা । নান রকমের ডট কলমের কালি দিয়ে তাকে রঙিন করা হয়েছে । খাতাটি জীর্ণ । বহুবার থাকে খোলা বন্ধ করা হয়েছে। পুরনো বাদামী কাগজে মলাট করা। সেই ছোট্ট রঙিন ময়ূরটির পাশে অতি সযত্নে বাংলা হরফে একটি সংস্কৃত শ্লোক লেখা।

তৃণাদপি  সুনীচেন তরুরুপী সহিষ্ণুনা
অমানিন মান দেন কীর্তনিয়া সদা হরি ।।

আমি এই শ্লোক বহুবার শুনেছি । প্রবীণ বাউলদের মুখে। সনাতন বাবার কাছে। এমনকি জয়দেবের কিছু কিছু আখড়াতে এ লেখা দেখেছি বড় বড় করে লেখা। কিন্তু এর অর্থ কি তার কোনও ধারনা আমার ছিল না।

শশাঙ্ক বাবা আমাকে প্রশ্ন করতে সাহস দিতেন। তাই কোন কিছু জিজ্ঞেস করতে ঠেকতাম না। বাবা  বললেন এটাই বাউল সাধকের মূল কথা। এই শ্লোক বৈষ্ণবের কাছে পরম আদরণীয় ।

মহাপ্রভু রাধা ও কৃষ্ণের একই দেহে পুনরাগমন।  রাধাভাবে মাতোয়ারা হয়ে নাম সঙ্কীর্তন প্রকাশ করেন। অথচ প্রথমে ইনি ছিলেন দিগদর্শী তর্ক শাস্ত্রে বলীয়ান এক পণ্ডিত। মহাপ্রভুর অগণিত ভক্ত । তাঁরা সবাই গুণী ধ্যানী।  মহাপ্রভু  খুব  সংক্ষিপ্ত  ভাবে তাঁদের কে পথনির্দেশ দিলেন কেবল মাত্র আটটি শ্লোকে যা শিক্ষাষ্টকম  নামে পরিচিত হয় ।

শ্রী কৃষ্ণ কবিরাজ বিরচিত  শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের  অন্তলীলায়   শিক্ষাষ্টকমের উল্লেখ আছে যে মহাপ্রভু রাতভোর শ্রী স্বরূপ দামোদর গোস্বামী ও শ্রী রামানন্দ রায়ের সাথে শ্লোক আলোচনায় মগ্ন থাকতেন।শ্রী জয়দেব গোস্বামী বিরচিত শ্রী গীত গোবিন্দের শ্লোক , শ্রী বিল্বমঙ্গল স্বামী বিরচিত শ্রী কৃষ্ণকর্নামৃত শ্লোক সদাই আলোচনা ও পাঠ করতেন।  এভাবে তাঁর মহাভাবের উদয় হত । জীবনের শেষ যে বারো বছর মহাপ্রভু জগন্নাথ পুরী ধামে কাটিয়েছিলেন তিনি এইসব শ্লোক উচ্চারণে মগ্ন থেকেছিলেন ।মহাপ্রভু তাঁর জীবনের সব মিলে আটচল্লিশ বছর এই মর্ত্যধামে নাম ও লীলা প্রকাশ করেছিলেন । রচয়িতা  শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের ইশারায় উল্লেখ করে শ্রী শিক্ষাষ্টকম মহাশ্লোকের বর্ণনা দিয়ে তাঁর গ্রন্থ সমাপ্ত করেন।

শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতে যে অষ্ট স্বাত্তিক ভাবের কথা বলা হয়েছে বাউল মহাজনেরা তাঁদের রচিত পদে তা বারবার উল্লেখ করেছেন।বাউলেরা হোল  মহাভাবের ভাবী  এ কথা হাউরে গোঁসাই , পদ্মলোচন ও যাদুবিন্দুর মত মহা সাধক ও  পদাবলী  রচয়িতারা একবাক্যে স্বীকার করে গেছেন।

অন্ত্য লীলার এই শ্লোকে মহাপ্রভুর মহাভাবাবস্থার  বর্ণনা  যেন  কোন বাউলের বর্ণনা ।

 প্রেমোদ্ভাবিতহর্ষের্ষোদবেগদৈন্যার্তিমিশ্রিতম
লপিতম  গৌরচন্দ্রস্য  ভাগ্যবিদ্ভিনিষেব্যতে ।।

 

ভাগ্যবান সাধুরাই শ্রী গৌরাঙ্গের প্রেম হেতু উদ্ভাবিত হর্ষ ঈর্ষা উদ্বেগ দৈন্য ও আর্তি বিশিষ্ট প্রলাপ শ্রবণ করেন ।

এখানে যে বিষয়টি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে সেটা হল যেকোনো আধ্যাত্মিক মার্গে ঈর্ষা শোক প্রভৃতিকে দূরে রাখবার কথা বলা হয়েছে। অথচ মহাপ্রভু এইসব বিশিষ্ট ভাবে বিচরণ করছেন। এখানে যে ঈর্ষা দৈন্য শোক তা জাগতিক নয় , মহাপ্রভু কৃষ্ণ প্রেমে এ রস আস্বাদন করছেন।  যেমন বাউলের সহজ আনন্দ । আপনাতে মাতোয়ারা । তাই মহাপ্রভুর শিক্ষাষ্টকম বাউলের সহজপ্রেমমার্গ কে দর্শন করায়।

আকাশ সীমাহীন, যেমন পাখিরা যার যত শকতি ততটাই উড়তে পারে বাউলের সহজ ভাবাবস্থাও ঠিক সেরকম এপার ওপার কিছুরই শেষ পাওয়া কঠিন ।

আরেকটি ভাবনার বিষয় আমরা দেশের  স্বাধীনতার  একটি সময়ের পর থেকে সংস্কৃত ভাষা কে শুধু মাত্র ধর্মীয় ও  উচ্চজাতের ভাষা হিসেবে ধরে এসেছি।  যেহেতু আমরা বাউল চিন্তা আদর্শ কে উদার বলে ভাবি , আমরা ভাবি বাউল মহাজনেরা সংস্কৃত বর্জন করেছিলেন।  প্রাচীন বাউলদের হাতে লেখা খাতায় আমরা বহু সংস্কৃত শ্লোকের উল্লেখ পাই। এমন কই পুঁথি করচাতেও । বাউলের কিছু কিছু গুরুমন্ত্র ও অন্যান্য মন্ত্র এখনও সংস্কৃত ভাষাতে করা হয়।  শ্রী চৈতন্যের শিক্ষাষ্টকম অতি সরল সংস্কৃতে লেখা যা এখনো বাউলের শিক্ষা । আর চিরকালই থাকবে। হাউরে গোঁসাই এর পদে সংস্কৃত শব্দের খুব প্রয়োগ পাওয়া যায় ।

আর বেশী কিছু না বলে চলে আসি শিক্ষাষ্টকমে। প্রথমে মূল পদ সংস্কৃতে ঠিক যেমনটি শ্রী মহাপ্রভু রচনা করেছিলেন।   তারপর ভাষান্তর করে সরল বাংলা ভাষায় পদ্য ছন্দে তাকে ধরা হয়েছে।

চেতো-দর্পণ-মার্জনং ভব-মহা-দাবাগ্নি-নির্বাপণং
শ্রেয়ঃ-কৈরব-চন্দ্রিকা-বিতরণং বিদ্যা-বধূ-জীবনম্ ।
আনন্দম্বুধিবর্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং
সর্বাত্মস্নপনং পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্ ॥ ১॥

নাম্নামকারি বহুধা নিজ-সর্ব-শক্তিস
তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ ।
এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্-মমাপি
দুর্দৈবম্-ঈদৃশম্-ইহাজনি নানুরাগঃ ॥ ২॥

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা ।
অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ ॥ ৩॥

ন ধনং ন জনং ন সুন্দরীম্
কবিতাং বা জগদীশ কাময়ে ।
মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে
ভবতাদ্ ভক্তিঃ অহৈতুকী ত্বয়ি  ॥ ৪॥

অয়ি নন্দ-তনূজ কিংকরম্
পতিতং মাং বিষমে-ভবাম্বুধৌ ।
কৃপয়া তব পাদপংকজ-
স্থিতধূলিসদৃশং বিচিংতয় ॥ ৫॥

নয়নং গলদ্-অশ্রু-ধারয়া
বদনং গদ্গদরুদ্ধয়া গিরা ।
পুলকৈর্ নিচিতং বপুঃ কদা
তব নামগ্রহণে ভবিষ্যতি ॥ ৬॥

যুগায়িতং নিমেষেণ চক্ষুষা প্রাবৃষায়িতম্ ।
শূন্যায়িতং জগত্ সর্বং গোবিন্দবিরহেণ মে ॥ ৭॥

আশ্লিষ্য বা পাদ-রতাং পিনষ্টু মাম্-
অদর্শনান্ মর্ম-হতাং করোতু বা ।
যথা তথা বা বিদধাতু লম্পটঃ
মত্-প্রাণনাথস্ তু স এব নাপরঃ ॥ ৮॥

বহু দিনের জমা ধুলো মনেরই আয়নায় ।
মুছিয়ে দিলেন তা পরম করুণায় ।।
সংসার দাবানল হল অবসান ।
সে শান্তি নির্মল জলে।।
পরম মঙ্গলময় শ্বেত কমল ছটা ।
সে যেন চাঁদের কিরণে ।।
পরম বিদ্যা প্রাণনাথ ।
তিনি গাহিলেন আনন্দ গান।।
পদে পদে ঝরে অমৃতবিন্দু ।
নাহি অবসান ।।
সে অমৃত খাইয়া প্রেমন্মাদ হইল ।
শ্রী কৃষ্ণ সঙ্কীর্তন জয়জয়াকারে মাতিল ।। ১।।

কি কহিব প্রিয় তোমার এ রূপ করুণা ।
আপন নামে রাখিলে স্বশক্তি বহুগুনা ।।
তব নাম স্মরণের লাগি দিলা অবসর ।
তবুও  না হইল অনুরাগ মোর ।
মুই হই এমনি পামর ।। ২।।

অনুরাগী হইয়া আপনারে মানে তৃণাধম।
দুই প্রকারে সহিষ্ণুতা করে বৃক্ষ সম ।।
বৃক্ষে যেমন কাটিলেও না কিছু বোলয় ।
শুখাইয়া মরিলেও কাউরে বারি না মাঙ্গয় ।।
যেই যে চাহে তাহে দেয় আপনার ধন ।
ঘর্ম বৃষ্টি সহে করে আনেরে রক্ষণ ।।
উত্তম হইয়া বৈষ্ণব হবে নিরাভিমান।
জীবে সম্মান দিবে জানি কৃষ্ণ অধিষ্ঠান ।। ৩।।

ধন জন নাহি মাঙ্গি ।
কি সুন্দরী বা কবিতা ।।
জন্মজন্মান্তরে যেন হয় শুদ্ধাভক্তি অহেইতুকী ।
শুধু তোমারি কৃপা।। ৪ ।।

তোমার নিত্যদাস মুই তোমারে পাশরিয়া ।
পড়িয়াছি  ভবার্ণবে মায়াবদ্ধ হইয়া ।।
কৃপা করে কর মোরে পদধূলি সম ।
তোমার সেবক করিয়া করাও তোমারি সেবন ।।৫।।

কবে বা হব আমি বচন রুদ্ধ তোমার নাম গাহিয়া গাহিয়া ।
আনান্দাশ্রু বহিবে মোর।
পুলকে পুলকে কণ্টকিত হইবে এই দেহা ।।৬ ।।

উদ্বেগে মোর দিন না কাটে মুহূর্ত হইল যুগসম।
বর্ষার মেঘ প্রায় অশ্রু বর্ষে নয়ন ।।
গোবিন্দ বিরহে জগত শূন্য জ্ঞান  হয় ।
তুষানলে পোড়ে যেন না যায় জীবন ।। ৭।।

আমি কৃষ্ণপদদাসী তাঁহার  রসসুখরাশি
আলিঙ্গন করে আত্মসাথ  ।
কি বা না দেন দরশন ভাঙেন যদি আমার দেহমন ।
তবুও  তিনি মোর পরান নাথ ।।
কি বা অনুরাগ করে কি বা দুখ দিয়া মারে ।
তাঁর চরণেই পাই আমি বিশ্রাম ।
কৃষ্ণ সেবা বই অন্য কিছু আর না লয় মনে ।।

 

উপরের এই বাংলা পদ টি গাইতে পেরেছিলাম ।  এখানে সেটি কে আবার তুলে ধরতে পেরে ভাল লাগল ।জয়গুরু ।

By: Parvathy Baul

Parvathy Baul is a practitioner of the Baul path. She trained in music and dance as a child, and spent time learning painting at Shantiniketan. While at Shantiniketan, she came across Baul, and never looked back as she met her first Guru Sanatan Das Baul, and was then sent to her second Guru, Shashanko Goshai. She now spreads the message of her lineage across the world through Baul.